বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের দাম হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে। আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সয়াবিন তেলের দাম লিটারে প্রায় ৯ টাকা বাড়িয়েছে। এ ঘটনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
বুধবার রাজধানীর কয়েকটি বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব ব্র্যান্ডের বোতলজাত সয়াবিন তেল বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। নতুন করে বাজারে আসা পাঁচ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৯৬৫ টাকায়। এ ছাড়া বোতলজাত প্রতি লিটার ১৯৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বোতলজাত প্রতি লিটার এতদিন ১৮৯ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। তবে এক ও দুই লিটারের নতুন দরের বোতল এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করা হয়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুমতি ছাড়া দাম বাড়ানো আইনসঙ্গত নয়। তারা মনে করছেন, ব্যবসায়ীরা একযোগে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিনিময় হার ওঠানামার কারণে তারা বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে হয়েছে।
ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধিতে ভোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে খাদ্যতালিকা সংকুচিত করতে হচ্ছে। দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া দাম বাড়ানো আইনের ব্যত্যয় এবং এটি ভোক্তাদের প্রতি অন্যায়।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীরা সরকারকে না জানিয়েই দাম বাড়িয়েছে, যা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, সরকার গতকাল যে দামে টিসিবির জন্য ভোজ্যতেল কিনেছে, আজ বাজারে তার চেয়ে ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তিনি এর যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, দাম বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয় বা ট্যারিফ কমিশনের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেছেন, ব্যবসায়ীদের এই বক্তব্য সরকার মানতে পারছে না।
ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেছেন, অনুমতি ছাড়া দাম বৃদ্ধি ভোক্তার অধিকারের প্রশ্ন। তিনি মনে করেন, এটি আইনের ব্যত্যয় এবং সরকারকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাজারে তদারকি জোরদার করা জরুরি, যাতে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা হয়।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানিগুলো গত ১০ নভেম্বর দাম বাড়ানোর জন্য চিঠি দিয়েছিল এবং ২৪ নভেম্বর থেকে তা কার্যকর করার কথা জানিয়েছিল। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সরকার অনুমতি দেয়নি। ব্যবসায়ীরা যুক্তি দিচ্ছেন, আইন অনুযায়ী তারা দাম বাড়াতে সক্ষম।
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম মোল্লা দাবি করেছেন, সরকারকে জানিয়েই দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেছেন, দাম বাড়ানো হয়েছে কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
গত অক্টোবরেও একইভাবে অনুমতি ছাড়া ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল কোম্পানিগুলো। তখন সরকারের হস্তক্ষেপে তারা সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এবারও সরকার ও ব্যবসায়ীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।




