লালনসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানে। রবিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাতে জানাজা শেষে তাঁকে মা–বাবার কবরে চিরশায়িত করা হয়।
জানাজার আগে শিল্পীর ছেলে ইমাম নাহিল বলেন, “আম্মার শেষ ইচ্ছা ছিল কুষ্টিয়ায় এসে মা–বাবার কবরে শায়িত হওয়া—আমরা সেটাই পূরণ করেছি।” এ সময় সেখানে দুই ছেলে ইমাম নাহিল ও ইমাম নিমেরী, মেয়ে জিহান ফারিয়া ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। জানাজা–দাফন শেষে পরিবারের পক্ষ থেকে শিল্পীর জন্য দোয়া কামনা করা হয়েছে।
ফরিদা পারভীন শনিবার রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। মরদেহ কুষ্টিয়ায় পৌঁছানোর পর লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন, চিন্তক–কবি ফরহাদ মজহারসহ বিশিষ্টজনেরা শ্রদ্ধা জানান। জানাজা পড়ান কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মোল্লা মো. রুহুল আমীন।
শিল্পীর মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সংস্কৃতি ও মৎস্য–সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টাসহ সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টারা, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শোকবার্তা দিয়েছে।
চিন্তক ফরহাদ মজহার জানাজাস্থলে বলেন, “ভাবসংগীতের দীর্ঘ ঐতিহ্যের যে ছেঁড়া সুতাটি ছিল, ফরিদা পারভীন সেটি আবার গেঁথে দিয়েছেন।”
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন বলেন, “বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তাঁর অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মরণ করবে।”
১৯৫৪ সালে ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানায় জন্ম নেন ফরিদা পারভীন।
শিল্পীর শৈশব কেটেছে বাবার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জেলায়। ছোটবেলায় মাগুরায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে সংগীতের হাতেখড়ি; পরে ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলীর কাছে স্বরলিপি ও নজরুলসংগীত রিয়াজ। ১৯৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুলসংগীতশিল্পী হন। স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ায় থাকাকালীন লালনসাঁইয়ের গানের সঙ্গে গভীর সংযোগ গড়ে ওঠে—মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে ‘সত্য বল সুপথে চল’ শেখার মধ্য দিয়ে লালনগীতির তালিম শুরু; পরে খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছে সাধন–রিয়াজ। লালনের বাণী ও সুরকে শুদ্ধ উচ্চারণ, স্বকীয় পরিবেশনা ও গভীর ভুবনবোধে জনপ্রিয় করে তুলেছেন তিনি—দেশে–বিদেশে লালনচর্চার এক অনন্য মুখ হয়ে ওঠেন।
লালনসংগীতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। চলচ্চিত্রে ‘নিন্দার কাঁটা’ গানের জন্য ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী–নারী) এবং ২০০৮ সালে জাপানের মর্যাদাপূর্ণ ফুকুওকা পুরস্কার লাভ করেন।




