মঙ্গলবার

,

১৪ই এপ্রিল, ২০২৬

সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সহিংসতা বিবেচনায় দেশের সর্বত্র স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর অবস্থান নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ঝটিকা মিছিলসহ যেকোনো বেআইনি সমাবেশ কঠোর নজরদারিতে রাখার এবং নেপথ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

রবিবার প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

প্রেস সচিব বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই জাতীয় নির্বাচন হবে—“পৃথিবীর কোনো শক্তি এ নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না।” অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর ভোট আয়োজনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি চলছে। ৫ আগস্টের পর থেকে সারাদেশে প্রায় ১,৬০০ বিক্ষোভ–আন্দোলন হয়েছে (গড়ে দিনে চারটি), যার প্রায় ৬০০ শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট; সরকার ও আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।

শফিকুল আলম বলেন, ‘যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের ন্যূনতম ছাড় দেওয়া হবে না। সরকার মনে করে দেশের স্বার্থে জনগণসহ সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ থাকা অপরিহার্য।’

প্রেস সচিব জানান, বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘ডাকসু নির্বাচন যাতে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। পতিত ও পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি যখন দেখছে দেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং জুলাইয়ের হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িতদের বিচার যত দ্রুততর হচ্ছে, তত তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু। তারা দেশের সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যহত করার জন্য সকল শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে।’

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেছেন যে আসন্ন দুর্গাপূজায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে নানা রকম ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা হতে পারে। তিনি বলেন, ‘গত বছরের দুর্গাপূজা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভালো অভিজ্ঞতা ছিল। তাই এবছরও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে আগেভাগেই সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

ব্রিফিংয়ে বলা হয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে দেশের সকল ধর্মভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধর্ম উপদেষ্টা শীঘ্রই এসব সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে জুলাই হত্যাকাণ্ডের পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্য পুনরায় দৃঢ় রাখার এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্পর্ক সুসংহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। নির্বাচনের সময় কোথাও নিরাপত্তাজনিত কোনো অঘটন যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঝটিকা মিছিল ও বেআইনী সভা-সমাবেশ মনিটরিং জোরদার এবং যারা এর পেছনে সক্রিয়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ও অপূর্ব জাহাঙ্গীর উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে যেসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা নেওয়া হয়েছে—ঝটিকা মিছিল ও বেআইনি সমাবেশ মনিটরিং জোরদার; উস্কানিদাতা–পরিকল্পনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা। স্থানীয় প্রশাসনকে সাম্প্রতিক সহিংসতা ঠেকাতে “কঠোর” অবস্থান নিতে নির্দেশ; নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয় ও আগাম প্রস্তুতি জোরদার। আসন্ন দুর্গাপূজায় গত বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগেভাগেই বিশেষ নিরাপত্তা; সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে সব ধর্মভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকের নির্দেশ। ডাকসু নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে সংশ্লিষ্টদের সর্বাত্মক সহযোগিতা। “জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫” বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমঝোতা হয়েছে; নির্ধারিত সময়েই চূড়ান্তকরণে আশাবাদ।

রাজবাড়ীর নুরাল পাগলার মাজারে হামলা প্রসঙ্গে প্রেস সচিব জানান, স্থানীয় প্রশাসনের কোনো গাফিলতি ছিল না; শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির অনুমতি দিয়েও পরবর্তীতে পরিস্থিতি অশান্ত হয়। ভিডিও বিশ্লেষণে সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছে; তদন্ত অব্যাহত।

সরকারের অবস্থান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ বা গ্রাহকসেবা ব্যাহতকারী অবৈধ কর্মসূচির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জুলাইয়ের হত্যাযজ্ঞে জড়িতদের বিচার দ্রুত এগোচ্ছে; “পতিত ও পরাজিত ফ্যাসিবাদী” শক্তির উসকানিতে শান্তি–শৃঙ্খলা ভঙ্গের চেষ্টা জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে রূপ নিয়েছে—এই প্রেক্ষাপটে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক ঐক্য জরুরি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিদ্যুৎ–জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র) খোদা বকশ চৌধুরী, আইজিপি বাহারুল আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।