সোমবার

,

১৯শে জানুয়ারি, ২০২৬

রাশিয়া-আমেরিকা ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষায় নরেন্দ্র মোদি

নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন তিনি। তেল, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে একাধিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন সময়ে পুতিনের ভারত সফর হচ্ছে যখন নয়াদিল্লি ওয়াশিংটনের সঙ্গে রুশ তেল আমদানি নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েনে জড়িয়ে পড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সুযোগে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়িয়েছে, যা বর্তমানে ভারতের মোট আমদানির ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। আমেরিকা এতে অসন্তুষ্ট এবং অক্টোবরে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। ফলে ভারতীয় কোম্পানিগুলো রুশ তেল আমদানি কমিয়ে দেয়। পুতিনের সফরে এ ক্রয় পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা খাতে ভারত রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। সু-৫৭ যুদ্ধবিমান ও এস-৪০০ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি রাশিয়া থেকে আসে। তবে নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। ভারত উন্নত এস-৫০০ সিস্টেম ও সু-৫৭ যুদ্ধবিমান কেনায় আগ্রহী, কিন্তু রাশিয়ার উৎপাদন সংকটের কারণে মোদি নিশ্চয়তা চাইবেন।

পুতিনের সফরের আগে রাশিয়ার পার্লামেন্ট ভারতের সঙ্গে ‘রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিক সাপোর্ট’ (রেলোস) চুক্তি অনুমোদন করেছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের সামরিক বাহিনী একে অন্যের পরিকাঠামো ব্যবহার করতে পারবে। এই চুক্তি দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও গভীর করবে।

অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কবিরোধী নীতি ও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমা চাপ ভারতের জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূতরা সম্প্রতি যৌথ নিবন্ধে রাশিয়ার ইউক্রেননীতি সমালোচনা করায় মোদির ওপর পশ্চিমা চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে।

ভারত এখন একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। রাশিয়া ভারতের মূল অস্ত্র সরবরাহকারী হলেও ইউক্রেন যুদ্ধের পর আমদানি কমেছে। ফলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুমুখীকরণের চিন্তা করছে দুই দেশ। গবেষণা সংস্থা চ্যাটহ্যাম হাউস জানিয়েছে, পুতিনের সফরে শ্রমিক সরবরাহের লক্ষ্যে চুক্তি হতে পারে। এতে দক্ষ ভারতীয় শ্রমিকরা রাশিয়ায় কাজের সুযোগ পাবেন, যা আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সহায়ক হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পুতিনের সফর ভারতের জন্য এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষা। মোদিকে একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার টালমাটাল ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই সফর ভারতের বৈশ্বিক উচ্চাভিলাষী অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ভারত কোন দিকে অবস্থান নেবে—রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা নাকি আমেরিকার চাপ—এটাই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।